Joe Cool

চিকিৎসক-প্রকৌশলীর বাইরে: বাংলাদেশের মেধাবীদের জন্য অ্যাকচুয়ারি পেশার অজানা সম্ভাবনা

· Prothom Alo

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন বাংলাদেশের প্রায় সব অভিভাবক। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ঘুরপাক খায় কিছু পরিচিত শব্দ—চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সিএসই কিংবা বিবিএ-এমবিএ। ভালো ফলাফল মানেই মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং বা এসব জনপ্রিয় বিষয়ে ভর্তি, এই ধারণা বহুদিনের, প্রায় অটল। কিন্তু প্রশ্ন হলো বদলে যাওয়া এই সময়ে এমন একমুখী স্বপ্ন কি সত্যিই বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ?

আজকের বিশ্বে কর্মক্ষেত্র আর আগের মতো সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি, ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জটিলতা এমন নতুন নতুন পেশার জন্ম দিয়েছে, যা আগে কেউ কল্পনাও করেননি। এর মধ্যেই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এখনো তুলনামূলকভাবে অচেনা পেশা হলো অ্যাকচুয়ারি।

Visit afnews.co.za for more information.

ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী গণিতে অসাধারণ, বিশ্লেষণী চিন্তায় তীক্ষ্ণ, কিন্তু জীববিজ্ঞান বা প্রচলিত প্রকৌশল বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। তাঁর জন্য কি কোনো সম্মানজনক, উচ্চ আয়ের, আন্তর্জাতিক মানের পেশা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আমরা সেই পথ দেখাই না বরং পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই তাঁকে আটকে রাখি। অথচ এই অদেখা ও অবহেলিত, কিন্তু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পেশার নাম অ্যাকচুয়ারি।

অ্যাকচুয়ারি: ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক পেশা

অ্যাকচুয়ারি এমন একটি পেশা, যেখানে ভবিষ্যৎকে অনুমান নয়, বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝা হয়। গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি ও ডেটা অ্যানালিটিকসের সমন্বয়ে একজন অ্যাকচুয়ারি ভবিষ্যতের ঝুঁকি নির্ধারণ করেন। কত মানুষ অসুস্থ হতে পারেন, কতজন বিমার দাবি তুলতে পারেন, একটি কোম্পানির আর্থিক দায় কত হতে পারে—এসব প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক উত্তর বের করাই তাঁদের কাজ। অর্থাৎ অনিশ্চয়তার পৃথিবীতে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কাজ করেন এই পেশাজীবীরা।

আজকের বিশ্ব অর্থনীতি মূলত ‘রিস্ক বেজড ইকোনমি’। ব্যাংক, বিমা কোম্পানি, পেনশন ফান্ড, ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠান, এমনকি টেক কোম্পানির অ্যালগরিদম—সব জায়গাতেই ঝুঁকি বিশ্লেষণ অপরিহার্য। অ্যাকচুয়ারিরা এখানে শুধু সংখ্যা বিশ্লেষক নন, বরং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম চালিকাশক্তি।

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে অ্যাকচুয়ারি পেশার গুরুত্ব বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে এটি অন্যতম উচ্চ আয়ের ও সম্মানজনক পেশা। এসব দেশে একজন পেশাদার অ্যাকচুয়ারি সাধারণত ব্যাংকিং, ইনস্যুরেন্স, পেনশন ম্যানেজমেন্ট এবং করপোরেট রিস্ক ম্যানেজমেন্টে কাজ করেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাকচুয়ারি পেশা একটি অত্যন্ত কাঠামোবদ্ধ পেশাগত পথ, যেখানে ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করতে হয়।

উন্নত দেশগুলোতে অ্যাকচুয়ারিয়াল পেশা এখন আর শুধু বিমা খাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বিস্তৃত ও আধুনিক ডেটা ড্রিভেন রিস্ক/// সায়েন্সে রূপ নিয়েছে। অ্যাকচুয়ারিরা বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সাইবার রিস্ক মডেলিং, স্বাস্থ্য অর্থনীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল তৈরির মতো অত্যাধুনিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ফলে এটি আর কেবল গতানুতিক ইনস্যুরেন্স চাকরি নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক বিশ্লেষণধর্মী পেশা, যা বিভিন্ন খাতে ঝুঁকি নিরূপণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে। এই বিস্তৃত পরিসরে অ্যাকচুয়ারির কর্মক্ষেত্র এখন জীবন ও স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড, ব্যাংকিং ও আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ বিশ্লেষণ ও ক্যাশ ফ্লো মডেলিং, করপোরেট রিস্ক মডেলিং, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিনির্ধারণ এবং আইটি ও ডেটা অ্যানালিটিকস খাত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে অ্যাসেট লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট (এএলএম), ক্রেডিট রিস্ক বিশ্লেষণ ও ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি মূল্যায়নে অ্যাকচুয়ারিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে অ্যাকচুয়ারি পেশার বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অ্যাকচুয়ারি পেশার গুরুত্ব আরও বেশি। বর্তমানে প্রায় ৮২টি বিমা প্রতিষ্ঠান রয়েছে (৩৬টি জীবন বিমা ও ৪৬টি সাধারণ বিমা) কিন্তু এই বিশাল খাতে ঝুঁকি বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি—অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।

বাংলাদেশে বিমা খাত এবং আর্থিক খাতের সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও এর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল ও অনিশ্চয়তাপূর্ণ। এ খাতে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার মাত্রা বেশি অথচ সারা বিশ্বব্যাপী বিমা জনপ্রিয় ও জিডিপিতে অবদান অনেক বেশি। বিজ্ঞানসম্মতভাবে ঝুঁকি নিরূপণ করে বিমা ও আর্থিক খাতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান অন্তরায় অ্যাকচুয়ারিয়াল জ্ঞানের ঘাটতি।

বাংলাদেশের বিমা খাতে অ্যাকচুয়ারিয়াল পেশায় সম্পৃক্ত জনবলের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে দেশে মাত্র কয়েকজন (প্রায় তিনজন) স্বীকৃত পেশাদার অ্যাকচুয়ারি রয়েছেন, এর মধ্যে দুজন দেশে কাজ করছেন। একজনের বয়স ৮৮ বছর, আরেকজন নারী, বয়স ৩০–এর কোটায় আর একজন অ্যাকচুয়ারি প্র্যাক্‌টিস করেন না। আরও কিছু বাংলাদেশি অ্যাকচুয়ারি রয়েছেন, যাঁরা বিদেশে কাজ করছেন, যার মধ্যে দুই বা একজন দেশি বিমা খাতে কাজ করছেন। এ দেশের অ্যাকচুয়ারি পেশাজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রায়ই অধিক আর্থিক সুবিধা এবং সম্মানজনক পজিশনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ফলে এ পেশার কর্মক্ষেত্র প্রকৃত অর্থেই বৈশ্বিক।

আমাদের প্রতিবেশী এশিয়ার অন্যান্য দেশ, যেমন ভারতে ৬১৪ জন, পাকিস্তানে ৬৯ জন, মালয়েশিয়ায় ৯৫০ জন, সিঙ্গাপুরে ২৬৩ জন, থাইল্যান্ডে ১৫৪ জন, জাপানে ৩ হাজার ১৭১ জন অ্যাকচুয়ারি রয়েছেন। ওই সব দেশে অ্যাকচুয়ারি সায়েন্সে অধ্যয়নের পর্যাপ্ত সুযোগও রয়েছে।

অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স অধ্যয়নের সুযোগও বাংলাদেশে সীমিত। ২০১৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্সে ডিপ্লোমা এবং মাস্টার্স কোর্স চালু করা হলেও পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের অভাব এবং তাঁদের ঝরে পড়ার কারণে কোর্স বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স একাডেমিতে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিষয়ে একটি ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে, তবে সেটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পেশাদার অ্যাকচুয়ারি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত নয়। ২০২০ সালে অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাকচুয়ারিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রামে স্কলারশিপের আওতায় দুই বছর মেয়াদি প্রোগ্রামে বৃত্তি প্রদান করা হয়। কিন্তু এ পদক্ষেপ আশানুরূপ ফলদায়ক হয়নি। মূলত অ্যাকচুয়ারিয়াল পেশাকে বাংলাদেশের বিমা খাতে এবং আর্থিক খাতে যথাযথ স্থানে উন্নীত ও সঠিক মানে মূল্যায়ন করা যায়নি।

বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কর্তৃক জারিকৃত ‘অ্যাকচুয়ারির যোগ্যতা ও দায়িত্ব প্রবিধানমালা’, ২০২৩ অনুযায়ী প্রতিটি জীবন বিমা কোম্পানির জন্য একজন পেশাদার অ্যাকচুয়ারি নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হলেও দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যাকচুয়ারি না থাকায় অধিকাংশ কোম্পানি এ বিধান পরিপালনে ব্যর্থ হচ্ছে।

পেশাদার অ্যাকচুয়ারি এর অপ্রতুলতার কারণে প্রিমিয়াম নির্ধারণ, পলিসি মূল্যায়ন, রিজার্ভ হিসাব, দাবি ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বিমা পণ্য তৈরিতে একধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে। এই দুর্বলতা সরাসরি গ্রাহকের নিরাপত্তা এবং পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বব্যাপী এখন বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ‘রিস্ক বেজড ক্যাপিটাল (আরবিসি)’ এবং আইএফআরএস ১৭–এর মতো জটিল আর্থিক রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করছে। এসব কাঠামো বাস্তবায়নে অ্যাকচুয়ারির ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিগত ও পেশাগত সক্ষমতা এখনো সীমিত। অ্যাকচুয়ারিয়াল জ্ঞানের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের বিমা খাতে এখনো বৈজ্ঞানিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল কিন্তু ডেটাভিত্তিক নয়। দুর্বল রিস্ক মডেলিং মানে ভবিষ্যতে আর্থিক অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা।

২০১৮ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্সে ডিপ্লোমা এবং মাস্টার্স কোর্স চালু করা হলেও পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের অভাব এবং তাঁদের ঝরে পড়ার কারণে উক্ত কোর্সগুলো বন্ধ হয়ে যায়।

এই সংকট শুধু একটি পেশার অভাব নয়, এটি একটি বড় সম্ভাবনার অপচয়। কারণ, যেখানে চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম, সেখানে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে সেটি একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার ইকোসিস্টেমে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি, ফিন্যান্স বা ডেটা সায়েন্সে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যাকচুয়ারি হতে পারে একটি আদর্শ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্সে পেশাগত যোগ্যতা

তবে এই পথ খুব সহজ নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অ্যাকচুয়ারি হতে হলে অ্যাকুরিয়াল সায়েন্স বিষয়ে স্নাতক শেষ করে ধাপে ধাপে পেশাগত পরীক্ষা পাস করতে হয়। এ লেভেল বা এইচএসসি পাসের পর করা যায়, তবে কঠিন হয়। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতো। সাধারণত এসব পরীক্ষায় সম্ভাব্যতা, আর্থিক গণিত, ঝুঁকি মডেলিং, অর্থনীতি, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং অ্যাকচুয়ারিয়াল মডেলিং (প্রবাবিলিটি, ফিন্যান্সিয়াল, ম্যাথমেটিকস, রিস্ক মডেলিং, ইকোনমিকস, ডেটা অ্যানালাইটিং ও অ্যাকচুয়ারিয়াল মডেলিং) অন্তর্ভুক্ত থাকে। পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এই কঠিন পথই শেষ পর্যন্ত এনে দেয় বৈশ্বিক স্বীকৃতি, উচ্চ আয় ও পেশাগত নিরাপত্তা। একজন যোগ্য অ্যাকচুয়ারি বিশ্বের যেকোনো দেশে কাজ করার সুযোগ পান।

বিশ্বের যেসব পেশাদার প্রতিষ্ঠান অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্সে পেশাদার স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে, তার অন্যতম হচ্ছে ইনস্টিটিউট অ্যান্ড ফ্যাকাল্টি অব অ্যাকচুয়ারিজ (আইএফওএ), ইউকে; ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচুয়ারিজ অস্ট্রেলিয়া, সোসাইটি অব অ্যাকচুয়ারিজ (এসওএ) বা ক্যাজুয়ালটি অ্যাকচুয়ারিয়াল সোসাইটি (সিএএস)।

একজন ব্যক্তিকে (আইএফওএ)-এর অ্যাসোসিয়েট হিসেবে যোগ্য হতে ১০টি বিষয় পাসসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। ইউএসএ সিস্টেমেও ১০টি বিষয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করে এবং ফান্ডামেন্টালস অব অ্যাকচুয়ারিয়াল প্র্যাক্‌টিস এবং অ্যাসোসিয়েটশিপ প্রফেশনালিজম কোর্স সম্পন্ন করে সোসাইটি অব অ্যাকচুয়ারিজের অ্যাসোসিয়েটের মর্যাদা অর্জন করতে হয়। ফেলোশিপ অর্জনের ক্ষেত্রে অ্যাসোসিয়েট যোগ্যতার সব প্রয়োজনীয়তা সম্পন্ন করার পর নির্বাচনী পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়।

ইউএসএ এবং ইউকে ছাড়াও অনেক দেশ পেশাদার অ্যাকচুয়ারিয়াল সংস্থা/ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে, যা অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্সে পেশাদার কোর্স অফার করছে। যাঁরা এই ধরনের কোর্স সম্পন্ন করেন এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকচুয়ারিয়াল ইনস্টিটিউট দ্বারা নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ করে, তাঁরা অ্যাকচুয়ারি হিসেবে কাজ করার যোগ্য হন। সাধারণত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকচুয়ারিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের (আইএএ) পূর্ণ সদস্য সংস্থাগুলো (যেমন আইএফওএ ও এসওএ) নিজস্ব পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যাকচুয়ারিদের যোগ্যতা যাচাই করে সংস্থার অ্যাসোসিয়েট/ফেলো ডিগ্রি দেয়। আইএএ এই সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের সদস্যদের জন্য একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।

বাংলাদেশে অ্যাকচুয়ারি পেশার বিকাশে আরেকটি বাধা হলো সচেতনতার অভাব। অ্যাকচুয়ারি শব্দ আমাদের দেশে প্রায় সব মানুষের কাছে অজানা, দেশে এই পেশা সম্পর্কে সচেতনতা এতটাই সীমিত যে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের আগপর্যন্ত অ্যাকচুয়ারি পেশার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায় না। একইভাবে অভিভাবকেরা প্রচলিত নিরাপদ ক্যারিয়ার পথের বাইরে ভাবতে অনিচ্ছুক। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী, যাঁরা এই পেশার জন্য আদর্শ, তাঁরা অন্যদিকে চলে যাচ্ছেন। এই জায়গায় পরিবর্তন জরুরি।

সব শিক্ষার্থীর জন্য একধরনের স্বপ্ন নির্ধারণ না করে তাঁদের নিজস্ব দক্ষতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেউ যদি বিশ্লেষণী চিন্তায় দক্ষ হন, গণিতে পারদর্শী হন, ডেটা নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন, তাহলে তাঁর জন্য অ্যাকচুয়ারি পেশা হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত পথগুলোর একটি। বিশ্বব্যাপী এখন ‘ডেটা ড্রিভেন ডিসিশন মেকিং’ অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে অ্যাকচুয়ারির চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

অ্যাকচুয়ারিয়াল পেশা উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ

বাংলাদেশেও ইতিমধ্যে এই পেশা গড়ে তোলার জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—বৃত্তি, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে। অ্যাকচুয়ারিয়াল পেশা উন্নয়নে বিমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ‘অ্যাকচুয়ারিয়াল পেশা উন্নয়নবিষয়ক ধারণাপত্র’-এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই ধারণাপত্রে বলা হয়েছে অ্যাকচুয়ারিয়াল মানবসম্পদ তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যাকচুয়ারিয়াল শিক্ষা বিস্তার, ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচুয়ারিজ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে তহবিল গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।

ধারণাপত্র অনুযায়ী, প্রধান বাধাগুলো হলো সচেতনতার অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, ক্যারিয়ার কাঠামোর অনুপস্থিতি, কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর অনাগ্রহ। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ডকুমেন্ট নয়, বরং বাংলাদেশের বিমা ও আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা। অ্যাকচুয়ারি পেশাকে টেকসইভাবে গড়ে তুলতে প্রস্তাবিত কার্যক্রমগুলো হলো—

ইনস্টিটিউট অব অ্যাকচুয়ারিজ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স অন্তর্ভুক্তি, বৃত্তি ও ট্রেইনিং কর্মসূচি, অ্যাকচুয়ারিয়াল ট্রেইনি অফিসার (এটিও) পদ সৃষ্টি, আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্ব (ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকচুয়ারিয়াল অ্যাসোসিয়েশন), বাধ্যতামূলক অ্যাকচুয়ারি নিয়োগ বাস্তবায়ন এবং সেমিনার ও ক্যারিয়ার ক্যাম্পেইন।

বিশেষ করে এই মডেল তরুণদের জন্য একটি কাঠামোগত কর্মজীবনের পথ তৈরি করতে পারে, যেখানে তাঁরা পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন।

একই সঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই পেশা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ, মানুষ জানলেই আগ্রহ তৈরি হবে আর আগ্রহ থেকেই তৈরি হবে নতুন প্রজন্মের অ্যাকচুয়ারি।

বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে প্রয়োজন দক্ষ ঝুঁকি বিশ্লেষক। ব্যাংকিং, বিমা, পুঁজিবাজার এবং পেনশনব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য অ্যাকচুয়ারি পেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই সময় এসেছে প্রচলিত চিন্তার বাইরে যাওয়ার। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সিএসই বা বিবিএ-এমবিএর পাশাপাশি অ্যাকচুয়ারি পেশাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবার। মেধাবী তরুণদের জন্য বার্তা একটাই—স্বপ্ন দেখো, কিন্তু পরিচিত পথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকো না। কারণ, অজানা পথেই অনেক সময় লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। অ্যাকচুয়ারি পেশা হতে পারে সেই অজানা পথ, যেখানে মেধা পায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি, পরিশ্রম পায় যথাযথ মূল্য আর একটি দেশের আর্থিক ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে আরও নিরাপদ ও টেকসই।

*লেখক: সাইফুন্নাহার সুমি, মিডিয়া ও কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ; বিমা ও আর্থিক খাত নিয়ে কাজ করছেন। মেইল: [email protected]

Read full story at source

‘I want him to take my No.1 jersey’: Gutherson welcomes Dragons’ Drinkwater pursuit

· Sydney Morning Herald

প্রবাস থেকে সন্তানের কাছে লাশ হয়ে ফিরলেন বাবা

· Prothom Alo

শেষ সম্বল বাড়ি বিক্রি করে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রবাসে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবুল খায়ের (৪২)। দেশে তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে শিশুটির সখ্য গড়ে উঠেছিল। দেশে ফিরে প্রিয় সন্তানকে আর আদর করা হলো না তাঁর। প্রবাসে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। আজ তাঁর গ্রামের বাড়িতে লাশ এসেছে।

Visit goldparty.lat for more information.

আবুল খায়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের মোগড়া গ্রামের বাসিন্দা। কিরগিজস্তানের সোকুলুক শহরের একটি ইটভাটায় তিনি কাজ করতেন। গত ২০ মার্চ দুপুরে সেখানে কাজ করার সময় হঠাৎ মাটির স্তূপ তাঁর ওপর ধসে পড়ে। সহকর্মীরা উদ্ধারের আগেই ঘটনাস্থলে তাঁর মৃত্যু হয়।

আজ শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আবুল খায়েরের লাশ আসে মোগড়া গ্রামের বাড়িতে। এ সময় স্বজনদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। প্রতিবেশীরাও তাঁর লাশ দেখতে সেখানে ভিড় করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে বিয়ে করেন আবুল খায়ের। পরিবারের অভাব দূর করতে ওই বছরের জুন মাসে তিনি কিরগিজস্তানে পাড়ি জমান। তাঁর একমাত্র সন্তান মো. আরহাম। তার বয়স এখন ১৫ মাস। আধো আধো কণ্ঠে ‘বাবা, বাবা’ বলে শিশুটি ডাকে। আরহামের জন্মের আগেই কিরগিজস্তানে গিয়েছিলেন আবুল খায়ের। জীবিত বাবাকে কখনো ছুঁয়ে দেখতে পারবে না শিশু আরহাম।

আবুল খায়েরের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘তার সহায়-সম্বল বলতে কিছুই নেই। সে বিদেশ যাওয়ার পর তার স্ত্রী-সন্তানকে থাকার জন্য আমি আমার জায়গায় ঘর করতে দিয়েছি। এখন আরহামকে নিয়ে তার স্ত্রী কীভাবে চলবে, তা নিয়েই আমাদের পরিবারের সবার চিন্তা।’

Read full story at source